অনলাইন ডেস্ক
দেশে ইউরিয়া সারের মজুত সঙ্কট মোকাবেলায় আমদানিতে সাড়া দিচ্ছে না সরবরাহকারীরা। ইউরিয়া আমদানিতে ইতিমধ্যে সরকারের পক্ষ থেকে দু’দফা দরপত্র আহ্বান করলেও সরবরাহকারীদের কাছ থেকে আশানুরূপ সাড়া মেলেনি। অথচ দেশে গ্যাস সঙ্কটে একটি বাদে সব ইউরিয়া সার কারখানার উৎপাদন বন্ধ রয়েছে। ফলে বর্তমানে দেশে নিরাপদ সীমার নিচে নেমে গেছে ইউরিয়া সারের মজুদ। এমন পরিস্থিতিতে বাংলাদেশ কেমিক্যাল ইন্ডাস্ট্রিজ করপোরেশন (বিসিআইসি) আসন্ন আমন মৌসুমের আগেই বেসরকারিভাবে দুই লাখ টন ইউরিয়া আমদানি করতে চাচ্ছে। ওই লক্ষ্যে দুই দফা দরপত্র আহ্বান করা হলেও সরবরাহকারীদের কাছ থেকে সাড়া পাওয়া যায়নি। ফলে রাষ্ট্রায়ত্ত সংস্থাটি পক্ষ থেকে এখন তৃতীয় দফায় দরপত্রে আহ্বানের কথা বিবেচনা করা হচ্ছে। বাংলাদেশ কেমিক্যাল ইন্ডাস্ট্রিজ করপোরেশন (বিসিআইসি) সংশ্লিষ্ট সূত্রে এসব তথ্য জানা যায়।
সংশ্লিষ্ট সূত্র মতে, দেশে বার্ষিক ২৬ লাখ টনের মতো ইউরিয়া সারের চাহিদা থাকলেও চলতি অর্থবছরে (২০২৫-২৬) এখন পর্যন্ত ১৩ লাখ ১৪ হাজার ৩৮৮ টন আমদানি হয়েছে। দেশে ৪ লাখ টন মজুদকে নিরাপদ ধরা হলেও এখন ইউরিয়া সারের মজুদ আছে ৩ লাখ ৪৩ হাজার টন। ফলে দেশে বর্তমানে ন্যূনতম নিরাপদ মজুদসীমার নিচে রয়েছে ইউরিয়া সার। যদিও বিসিআইসি আসন্ন আমন মৌসুম ঘিরে ইউরিয়ার মজুদ বাড়াতে দুই লাখ টন ইউরিয়া আমদানির জন্য উন্মুক্ত দরপত্রের আহ্বান করে। তাছাড়া জিটুজি (সরকার থেকে সরকার) ভিত্তিতে সৌদি আরব ও আরব আমিরাতের সঙ্গে আরো তিন লাখ টন ইউরিয়া আনার বিষয়েও আলোচনা চলছে। তবে হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচল স্বাভাবিক হওয়ার ওপর তা নির্ভর করছে। দেশে আগামী ২০২৬-২৭ অর্থবছরে ২৬ লাখ ২২ হাজার টন ইউরিয়া সারের চাহিদা রয়েছে। আর আসন্ন জুলাইয়ে শুরু হতে যাওয়া আমন ধানের মৌসুমে ৬ লাখ ৬৫ হাজার টন ইউরিয়ার চাহিদা রয়েছে।
সূত্র জানায়, ইউরিয়া সার বাংলাদেশ মূলত আমদানি করে সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত ও চীন থেকে। তাছাড়া কাতার থেকেও আমদানি করা হয়। কিন্তু মধ্যপ্রাচ্য সঙ্কটের কারণে সার আমদানিতে অনিশ্চয়তা তৈরি হওয়ায় বিকল্প উৎস খোঁজা হচ্ছে এখন। সে লক্ষ্যে ইতিমধ্যে ভিয়েতনাম, মালয়েশিয়া ও ব্রুনাইয়ের সঙ্গে আলোচনা হয়েছে। তাছাড়া রাশিয়া ও বাহরাইনের সঙ্গেও প্রাথমিক আলোচনা হয়েছে। মূলত মধ্যপ্রাচ্য সঙ্কটের কারণে ইউরিয়া সরবরাহ শৃঙ্খলে বাধা তৈরি হয়েছে। তাছাড়া বিশ্ববাজারে বেড়েছে সারের দামও। তাতে খরচ বেড়েছে। বিসিআইসি আগে ১৯ লাখ টন পর্যন্ত ইউরিয়া উৎপাদন করেছে। যা চাহিদার প্রায় ৮০ শতাংশ। এখন বছরে উৎপাদন করে মাত্র ৮-১০ লাখ টন। আর আমদানি করা হয় চাহিদার ৮০ শতাংশের মতো।
সূত্র আরো জানায়, চলতি বছরের মধ্যপ্রাচ্যের সঙ্কট শুরু পর থেকেই দেশে গ্যাস সঙ্কট শুরু হয়। তার জেরে বিসিআইসির পাঁচটি ইউরিয়া কারখানার মধ্যে চারটি এবং বহুজাতিক কোম্পানি কাফকোর উৎপাদন বন্ধ করে দেয়া হয়। তাছাড়া দেশের একমাত্র ডিএপি সার কারখানাটিও অ্যামোনিয়া সংকটে বন্ধ হয়ে গেছে। বর্তমানে নরসিংদীর ঘোড়াশাল-পলাশ সার কারখানাটিই (দৈনিক ২ হাজার ৮০০ টন উৎপাদন ক্ষমতাসম্পন্ন) কেবল চালু রয়েছে। একসময় চাহিদার প্রায় ৮০ শতাংশ ইউরিয়া দেশেই উৎপাদিত হতো। কিন্তু ধীরে ধীরে উৎপাদন কমে আমদানিনির্ভরতা বেড়েছে। বর্তমানে চাহিদার এক-তৃতীয়াংশেরও কম ইউরিয়া উৎপাদিত হয়। মূলত বিসিআইসি সার উৎপাদন ও আমদানির কাজটি করে থাকে।
এদিকে দুই লাখ টন ইউরিয়া সার আমদানির লক্ষ্যে বিসিআইসি প্রথম দফা আন্তর্জাতিক দরপত্রে কোনো সাড়াই পাওয়া যায়নি। তারপর দ্বিতীয়বার দরপত্র আহ্বান করা হয়। কিন্তু সেখানেও সরবরাহকারীদের কাছ থেকে কেবল ৫০ হাজার টন ইউরিয়া সরবরাহের জন্য দরপত্র পাওয়া গেছে। মূলত মধ্যপ্রাচ্যে বিদ্যমান যুদ্ধের কারণে হরমুজ প্রণালি দিয়ে জাহাজ চলাচল বন্ধ থাকায় সার সরবরাহ নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। এমন পরিস্থিতিতে সময়মতো সরবরাহ করা সম্ভব হবে না তা অনিশ্চয়তায় সরবরাহকারীরা ইউরিয়া সরবরাহে সাড়া দিচ্ছে না।
এদিকে দুই লাখ টন ইউরিয়া আমদানির বিষয়ে বিসিআইসির পরিচালক (বাণিজ্যিক, উৎপাদন ও গবেষণা) মো. মনিরুজ্জামান জানান, প্রথম দফার দরপত্রে কোনো প্রতিষ্ঠান অংশ নেয়নি। দ্বিতীয় দফায় যারা অংশ নিয়েছে সেগুলো যাচাই-বাছাই করা হচ্ছে। প্রয়োজনে আবার দরপত্র আহ্বান করা হবে।
অন্যদিকে এ প্রসঙ্গে বিসিআইসির ক্রয় বিভাগের মহাব্যবস্থাপক মো. সাইফুল আলম জানান, বিসিআইসি দুটি প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে দরপত্র পেয়েছে। তারা ২৫ হাজার করে ৫০ হাজার টন ইউরিয়া সার সরবরাহ করতে চায়। দরপত্রগুলো যাচাই-বাছাই করা হচ্ছে।